বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি : স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

লেখক: দাউদ হোসেন

তেতাল্লিশতম ‘কোলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলা’য় সংঘ প্রকাশন-এর স্টলে বসে আমি তাঁকে[★]করজোড়ে অনুনয় করে বললাম, দেখুন দাদা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমার বিশেষ কোন ভূমিকা নেই, অন্ততপক্ষে যেমনটা থাকলে সেটার একটা স্মৃতি থাকতে পারতো তেমনটা তো নেই-ই। তাই এ যাত্রায় আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর এমনিতেই আমি কোন কবি সাহিত্যিক নই যে, কলম ধরে ফসফস্ করে দু’চার পাতা লিখে দেবো। সবচেয়ে বড় কথা আমার হাতে এখন কিছু অন্তিম কাজ আছে—আমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগেই সেগুলি সম্পূর্ণ হওয়া দরকার। মহামতি কার্ল মার্ক্সের পুঁজি’র তৃতীয় খণ্ডের সংঘ-সংস্করণের কাজ চলছে—এটা সমাধা হলেই আপনার ‘জলঘড়ি'র জন্য এক সেট বই সৌজন্য হিসেবে দিয়ে দেবো। কিন্তু আমার কোনো কথাই তিনি শুনতে চাইলেন না। তাঁর সঙ্গে এখন যোগ দিয়েছেন অর্ধেন্দু শেখর গোস্বামী মহাশয়। স্বর্গীয় রাধাগোবিন্দ বসাক মহাশয় অনূদিত ‘কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র’-এর সংঘ-সংস্করণে আমার নিবেদিত ভূমিকাটি পাঠ করে তিনি এতোই আবেগতাড়িত হয়েছেন যে, শক্তিসাধন মুখার্জির সঙ্গে এখন জোট বেঁধেছেন। আর ‘আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে’ পাঠ করে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন শুভাশিস মুখার্জি। তাঁরা সবাই এসেছিলেন ঢাকায় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক ও কবিবর্গের লেখাপত্র সংগ্রহের উদ্দেশে। কাঁটাবনস্থ কনকর্ড শপিং কমপ্লেক্সের ভূগর্ভস্থ বইমার্কেটে সংঘ প্রকাশন-এর খুপরি ঘরেও তাঁরা পদার্পণ করেছিলেন। বিপ্র বেশে ভগবান আসেন ভক্তের দুয়ারে। এ তিন ব্রাহ্মণের বেশে তিনি এসেছিলেন কিনা জানি না, তবে তিনি আসুন বা না-ই আসুন, ব্রাহ্মণের সেবা করা আমার মোক্ষলাভের একমাত্র উপায় বিধায় আমি হাতের কাজ ফেলে রেখে তাদের সেবায় নিয়োজিত হওয়া মনস্থ করলাম।

প্রথমেই বলে রাখি বয়স আমার সত্তর পেরিয়ে গেছে পাঁচ-ছ'বছর আগেই। আজ থেকে সোয়াশো বছর আগে মহামতি ফ্রেডারিক এঙ্গেলস কার্ল মার্ক্স-এর Capital গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলেন, 'কোনো মানুষের বয়স সত্তর যখন পার হয়ে যায় তখন তার মস্তিষ্কের মেনার্ট অনুষঙ্গ তন্ত্রগুলি আর ভালভাবে কাজ করে না-অনেককিছুতে সে খেই হারিয়ে ফেলে। আগেকার বহুকিছু বিস্মৃত হয়, আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে’' আমার বেলায় এটা কতদূর গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলা মুস্কিল। তবে আমার বয়স যখন ছিল সাতাশ বছর তখন ঢাকায় সংঘটিত হয়েছিল সেই কালরাত্রি—পঁচিশে মার্চ, ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দ; পল্টন ময়দানে তখন প্রতিদিন কোন না কোন রাজনৈতিক দলের মিটিং সমাবেশ লেগেই থাকতো। সেদিনও ছিল। হাতে জরুরী কাজ না থাকলে আমরা এসে বসতাম ময়দানের একপাশে—নিজেদের আলাপ-আলোচনাগুলি সেরে নিতাম ফাঁকে ফাঁকে। আমরা মানে ‘জাতীয় মুক্তি সংস্থা’র সংক্ষেপে ‘জামুস’-এর ঢাকাস্থ নেতা-কর্মীরা। আমার সঙ্গে তখন সবসময় থাকতো ছোট্ট হিটাচী ট্রানজিস্টর। খবর আগেই ছড়িয়ে গিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ব্যর্থ। শেখকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। নানারকম গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। কারফিউ জারি করে হয়তো ধর-পাকড় চলতে পারে। ঢাকা অশান্ত হয়ে উঠেছে। সামরিক শাসনের মধ্যেই হয়তো রাস্তাঘাটে আর্মি নামতে পারে। আর রাস্তায় যদি তারা নামে তাহলে এবার অবশ্যই প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে। অন্যদিনের তুলনায় রাস্তাঘাট দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে যেন বারুদের গন্ধ। টঙ্গী, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা এসেছিল তাদেরকে দ্রুত ফিরে যেতে নির্দেশ দিলাম। ঢাকার বাইরে যদি কেউ যেতে চায়, তাহলে তারা যেন মীরপুর ও টঙ্গী পরিহার করে চলে—ঢাকা থেকে বাইরে আসা যাওয়ার পথে আর্মি চেকপোস্ট বসাতে পারে এমনটা মাথায় রেখে কর্মী ও নেতারা যেন চলাফেরা করে।

রাতে আমার মিটিং ছিলো ইকবাল হলে—সিরাজুল আলম খান, মাজহারুল হক বাকী ভাই, তোফায়েল আহমেদ, শাহীন স্কুলের প্রিন্সিপাল প্রমুখদের সঙ্গে—হাতে গোনা পাঁচ সাত জনের গোপন মিটিং। ইতিপূর্বে কয়েক দফা হয়েও গেছে। আমি ছাড়া অন্য যাঁরা ছিল সবাই ছাত্রলীগের শীর্ষ ঝানু নেতা। আলোচ্যসূচী ছিল আর্মি ক্রাকডাউন হলে প্রতিরোধ কীভাবে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion